ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক: করণীয় ও বর্জনীয়

ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক: করণীয় ও বর্জনীয় নির্দেশিকা

✦ ভূমিকা

বৈবাহিক সম্পর্ক মানব জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইসলাম ধর্মে এই সম্পর্ককে শুধুমাত্র পারস্পরিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং একটি পবিত্র চুক্তি ও দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী, একজন মুসলিম স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের জন্য “লিবাস” অর্থাৎ আবরণস্বরূপ (সূরা বাকারা ২:১৮৭)। এই সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে ভালোবাসা, দয়া, সহানুভূতি এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধ।


✦ ইসলামে বৈবাহিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি

বিষয় বিবরণ
চুক্তি বিবাহ একটি সামাজিক ও ধর্মীয় চুক্তি
ভালোবাসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মাওয়াদ্দাহ (ভালোবাসা) স্থাপন করেন
দয়া ও সহানুভূতি পারস্পরিক সহানুভূতির ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে ওঠে
সম্মান একে অপরকে সম্মান করা ফরজ
অধিকার ও দায়িত্ব উভয়ের আলাদা আলাদা অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে

✦ স্বামী-স্ত্রীর করণীয় বিষয়সমূহ

১. পরস্পরের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন

কুরআনে আল্লাহ বলেন:

“আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো: তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও।” (সূরা রূম ৩০:২১)

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এই সহানুভূতির অনুভূতি না থাকলে সম্পর্ক টিকে থাকা কঠিন।

২. একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করা

সংসারে ভুল বোঝাবুঝি হওয়াই স্বাভাবিক। তবে ইসলামে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, ভুল হলে ক্ষমা করে দেয়া এবং বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা।

৩. পারস্পরিক অধিকার রক্ষা করা

স্বামীর অধিকার স্ত্রীর অধিকার
শ্রদ্ধা ও আনুগত্য ভরণ-পোষণ ও নিরাপত্তা
পরিপূর্ণ গোপনতা রক্ষা ভালোবাসা ও সম্মান
বিশ্বাসযোগ্যতা পারিবারিক সেবা ও সহযোগিতা

✦ করণীয় সম্পর্কিত হাদীস

রাসূল (সা.) বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করে।” (তিরমিযী)

এই হাদীস আমাদেরকে শিক্ষা দেয়, একজন ভালো মুসলিম স্বামী কখনো স্ত্রীর সঙ্গে অসদাচরণ করতে পারে না।


✦ সংসার জীবনে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের উপায়

  1. একসঙ্গে ইবাদত করা – একে অপরকে তাহাজ্জুদ বা ফরজ নামাজে জাগিয়ে দেওয়া।

  2. পরস্পরের ভুল ক্ষমা করা – ভুলত্রুটি হলে দোষ না দিয়ে ক্ষমা করার মনোভাব রাখা।

  3. পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা – শুধু স্বামী নয়, স্ত্রীকেও পারিবারিক দায়িত্ববোধ রাখতে হবে।


✦ বর্জনীয় বিষয়সমূহ (পরবর্তী অংশে বিশদ আলোচনা করা হবে)

  • অহংকার করা

  • অতিরিক্ত রাগ

  • পারস্পরিক অবিশ্বাস

  • নির্যাতন

  • অশ্লীল কথা


✦ প্রথম অংশের উপসংহার

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু শরীরের নয়, বরং আত্মার সম্পর্ক। ইসলামে এই সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাই, এর পবিত্রতা রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।


✦ Internal Linking Suggestions (deenguide.info এর জন্য):

  • 👉 ইসলামে বিবাহের গুরুত্ব ও শর্তাবলী

  • 👉 নবী (সঃ) এর আদর্শ সংসার জীবন

  • 👉 নারীর অধিকার ইসলামে

    ✦ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যেসব আচরণ বর্জনীয়

    ইসলামে দাম্পত্য জীবনের স্থায়িত্বের জন্য কিছু নির্দিষ্ট বর্জনীয় আচরণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এগুলো সম্পর্ক নষ্ট করে, দাম্পত্য কলহ বাড়ায় এবং অনেক সময় বিচ্ছেদের কারণ হয়।

    ১. অহংকার ও জেদ

    স্বামী বা স্ত্রী কেউ যদি অহংকারে ভুগে এবং ‘আমি ঠিক, তুমি ভুল’ মানসিকতায় চলে, তবে সম্পর্ক নষ্ট হতে বাধ্য।

    📌 কুরআন বলে:

    “নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও দাম্ভিককে পছন্দ করেন না।” (সূরা লুকমান ৩১:১৮)


    ২. অতিরিক্ত রাগ ও গালমন্দ

    নবী (সা.) বলেছেন:

    “তুমি রাগ করো না।” – (বুখারী)

    রাগে অন্ধ হয়ে স্বামী-স্ত্রী যদি একে অপরকে কষ্ট দেয়, তবে তা সম্পর্কের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।


    ৩. পারস্পরিক অবিশ্বাস

    বিশ্বাস ছাড়া কোনো সম্পর্ক টিকে থাকতে পারে না। অনেকেই ছোট বিষয়ে সন্দেহ করে সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে।

    ✅ করণীয়:

    • একে অপরকে সময় দেয়া

    • খোলামেলা আলাপ

    • একে অপরের ব্যাক্তিগত গোপনীয়তার সম্মান রাখা


    ৪. পারিবারিক সহিংসতা বা মানসিক নির্যাতন

    ইসলামে কারো প্রতি জুলুম করা হারাম, তা সে স্ত্রী হোক বা স্বামী।

    📌 হাদীস:

    “আল্লাহ যালিমকে সুযোগ দেন, কিন্তু যখন তিনি তাকে ধরেন তখন আর রেহাই দেন না।” – (বুখারী)

    নির্যাতনের ধরন ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি
    শারীরিক মারধর স্পষ্টভাবে নিন্দিত
    মানসিক চাপে রাখা অমানবিক ও নিষিদ্ধ
    ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে বাধা কবিরা গুনাহ

    ✦ ভুল ধারণা: স্বামী সবকিছুর মালিক, স্ত্রী শুধুই অনুগত

    অনেক সমাজে মনে করা হয় স্বামী যেহেতু উপার্জন করে, তাই স্ত্রীকে শুধু শুনতে হবে। কিন্তু ইসলাম বলে:

    🟢 “পুরুষগণ নারীদের রক্ষণাবেক্ষণকারী কারণ আল্লাহ এককে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তারা ব্যয় করে।” (সূরা নিসা ৪:৩৪)

    এখানে দায়িত্ব ও দায়িত্বশীলতা বলা হয়েছে, মালিকানা নয়।


    ✦ বর্জনীয় বিষয়: স্ত্রীকে খারাপ ভাষায় সম্বোধন

    ইসলামে একে অপরকে সম্মান দিয়ে কথা বলার নির্দেশ আছে।

    📌 রাসূল (সা.) বলেন:

    “একজন মুসলিম কখনোই আরেকজন মুসলিম ভাই বা স্ত্রীর প্রতি কটূ ভাষা ব্যবহার করবে না।” (আবু দাউদ)


    ✦ বর্জনীয় আচরণ: ব্যক্তিগত বিষয় অন্যদের সামনে প্রকাশ করা

    স্বামী-স্ত্রীর গোপন কথা বা শারীরিক সম্পর্কের বিস্তারিত বন্ধু বা আত্মীয়দের সঙ্গে আলোচনা করা ইসলামে হারাম।

    হাদীস:

    “কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকবে সেই ব্যক্তি, যে স্ত্রী বা স্বামীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর তা অন্যদের কাছে প্রকাশ করে।” – (মুসলিম)


    ✦ ইসলামে বিচ্ছেদ বা তালাক – শেষ উপায়

    ইসলামে তালাক বৈধ হলেও এটি সবশেষ ও চূড়ান্ত উপায়। রাসূল (সা.) বলেন:

    📌 “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় বৈধ বিষয় হলো তালাক।” (আবু দাউদ)

    বিষয় ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি
    মনোমালিন্য সালিশ বা আলোচনা করা
    অবিশ্বাস্য সমস্যা পরিবারের মধ্যস্থতা
    বারবার নির্যাতন তালাক হতে পারে সমাধান

    ✦ টেবিল: করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় এক নজরে

    করণীয় বর্জনীয়
    পরস্পরের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি অহংকার ও জেদ
    একে অপরকে বোঝার চেষ্টা সন্দেহ ও অবিশ্বাস
    পারস্পরিক দায়িত্ব পালন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন
    সম্মান ও সম্মানজনক ভাষা কটূ কথা ও অপমান
    খোলামেলা আলোচনা তৃতীয় পক্ষকে বিষয় জানানো

উপসংহার

স্বামী ও স্ত্রী হলেন একে অপরের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত সঙ্গী, যারা পরস্পরের জন্য মায়া, শ্রদ্ধা ও সাহায্যের উৎস। ইসলামে তাদের সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে সম্মান, ভালোবাসা এবং ধৈর্য। করণীয় ও বর্জনীয় নিয়মগুলো মেনে চললে দাম্পত্য জীবন সুখী ও সুমধুর হয়।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পরস্পরের অধিকার ও দায়িত্ব বুঝে চলা অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে, অহংকার, অবজ্ঞা, ও অবিচার থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে নিয়মিত মutual respect এবং আল্লাহর স্মরণ অপরিহার্য।

আসুন, ইসলামের শিক্ষা মেনে আমরা নিজেদের দাম্পত্য জীবনকে শান্তিময়, মধুর ও বরকতময় করে তুলি। আল্লাহ আমাদের সকল দাম্পত্য জীবনে সুখ-শান্তি বর্ষিত করুন।

Leave a Comment